বাঙালি সংস্কৃতির আরেক উৎসব – রথযাত্রা

ad

বিচিত্র আমাদের বাঙালি সংস্কৃতি যার সাথে মিশে আছে বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব। তেমনই একটি উৎসব- রথযাত্রা। প্রতিবছর আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে শুরু হয় রথযাত্রা । উৎসবটি জগন্নাথদেবের রথযাত্রা নামেও পরিচিত। জগত অর্থ পৃথিবী আর নাথ অর্থ ঈশ্বর। জগন্নাথ মানে হল জগদীশ্বর। দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর জগন্নাথের বৃন্দাবন প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে বৃন্দাবনবাসীর মধ্যে যে ভালবাসা ও আবেগের প্রকাশ ঘটেছিল তা ছিল বড়ই করুণ ও প্রাপ্তির । দ্বারকা থেকে রথে চড়িয়ে উল্লাস করে বৃন্দাবনবাসীগণ প্রভুকে বৃন্দাবনে নিয়ে যায়। সেই ঘটনার স্মরণে সারা বিশ্বের হিন্দুরা এই রথযাত্রা পালন করে। প্রভু জগন্নাথের কৃপা পাওয়ার উদ্দেশে ভক্তরা টানা নয়দিন শ্রদ্ধা, ভালবাসা ও পুজার ফুলে ফলে মুখরিত করে রাখে জগন্নাথের রথ।

জগন্নাথের আবক্ষ মূর্তি

জগন্নাথের আবক্ষ মূর্তি

রাজধানী ঢাকার রথ যাত্রার ইতিহাস প্রায় সাড়ে তিনশত বছরের পুরনো। তবে সম্প্রতি ইসকনের আয়োজন রথযাত্রা উৎসবকে দিয়েছে নতুন মাত্রা। উল্লেখ্য, ১৯৬৮ সাল থেকে ইসকন প্রবর্তিত হরে কৃষ্ণ আন্দোলনের  ফলে বিশ্বের বিভিন্ন শহরে নতুন আঙ্গিকে শুরু হয় রথযাত্রা। ইসকনের নেতা এ সি ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ নিউ ইয়র্ক, টরেন্টো, মন্ট্রিল, লন্ডন, প্যারিস, ভেনিস প্রভৃতি শহরে রথযাত্রা উৎসবের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি করতে সক্ষম হন।

ভক্তকূল পরিবেষ্টিত হয়ে এগিয়ে চলেছে রথ

ভক্তকূল পরিবেষ্টিত হয়ে এগিয়ে চলেছে রথ

ঢাকায় রথযাত্রা উপলক্ষে ইসকন নয় দিন ব্যাপি বিভিন্ন আয়োজন করে। এর মধ্যে শোভাযাত্রা, আলোচনা অনুষ্ঠান, পূজা, আরতি, ভোগনিবেদন ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।  বিশ্ব প্রতিপালনের অবতার জগন্নাথ, বলরাম ও বোন সুভদ্রা—এই ত্রিমূর্তিধারী রথ টেনে শোভাযাত্রা বের করা হয়। ঢাকার শোভাযাত্রাটি জয়কালী মন্দির, মতিঝিল শাপলাচত্ত্বর, দৈনিক বাংলা মোড়, বয়তুল মোকাররম, জাতীয় প্রেসক্লাব, দোয়েল চত্ত্বর, রমনা কালীমন্দির, জগন্নাথ হল, পলাশী মোড় হয়ে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে গিয়ে শেষ হয়। ঢাকার সর্বস্তরের মানুষ এই শোভাযাত্রায় অংশ নেয়। এছাড়া পুরানো ঢাকার তাঁতী বাজার, শাঁখারী বাজার, সূত্রাপুর রামসীতা মন্দিরে রথযাত্রা হয়। সূত্রাপুর রামসীতা মন্দিরের রথটি জয়কালী মন্দির থেকে গুলিস্তান, নবাবপুর, রথখোলা, টিপু সুলতান রোড, ওয়ারী হয়ে আবার জয়কালী মন্দিরে গিয়ে শেষ হয়।

সমবেত ভক্তকূল

সমবেত ভক্তকূলের উচ্ছ্বাস

বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলে প্রায় রথযাত্রা পালিত হয়। বাংলাদেশের রথযাত্রা উৎসবের মধ্যে সাভার এবং ধামরাই-এর রথযাত্রা বাংলাদেশের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ রথ উৎসব।  সাভারের কানাইলাল মন্দিরের রথ ঐতিহ্যবাহী। এই রথের বয়স প্রায় ১৫০ বছর। এখানকার কানাইলাল জিউ বিগ্রহ মন্দিরের রথ অনেকটা এই অঞ্চলের মানুষের মিলন মেলায় পরিনত হয়। ধামরাইয়ের রথ পৃথিবী-বিখ্যাত।

রথযাত্রা উৎসবে থাকে ভক্তি, থাকে শ্রদ্ধা

আবার যশোরের রূপ-সনাতন স্মৃতি তীর্থ ধাম-এর রথ উৎসব বিগত বছরগুলোতে যথেষ্ট আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ইসকনের উদ্যোগে বৈষ্ণব মহান্ত রূপ ও সনাতনের স্মৃতি রক্ষার্থে যশোরের অভয়নগর উপজেলার রামসরাতে এই ধাম গড়ে উঠেছে। এখানে প্রতিবছর মহাসমারোহে রথযাত্রা পালিত হয়। খুলনার দৌলতপুর ও কালীবাড়ি মন্দিরেও রথ উৎসব পালিত হয়।

রথের সম্মুখভাগের দৃশ্য

রথের সম্মুখভাগের দৃশ্য

এছাড়া ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্চ, মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, শেরপুর, জামালপুর, চট্টগ্রাম, ফেনী, নোয়াখালি, লক্ষ্মীপুর, রংপুর, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, নীলফামারী, গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, রাজবাড়ি, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বরিশাল, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, বাগেরহাট, নড়াইল , মাগুরা, পাবনা, নাটোর, নওগাঁ প্রভৃতি স্থানেও রথযাত্রা পালিত হতে দেখা যায়। উত্তরবঙ্গের মধ্যে রাজশাহীর সাহেব বাজারে যে রথ হয় তা যথেষ্ট বড় এবং ঐতিহ্যবাহী।

লেখা ও গবেষণা ঃ মিয়াজি পাপন, মারুফ রহমান

ছবিঃ আল আমিন শান্ত, দেবান দত্ত

  • zamal uddin

    ঐতিহ্যের বাংলাদেশ, বাঙালি সংস্কৃতি… ভালো লাগলো পড়ে…

  • deban_datta

    এই ধরণের লেখাগুলো বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে প্রকৃতরূপে তুলে ধরতে পারবে বলে আমার মনে হয়।

  • Meaji Papon

    হিন্দু, মুসলমান… মিলিয়া বাউলা গান আর মুর্শিদি গাইতাম।। আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম…